সেনাবাহিনীর জন্য এটি একটি চিরস্থায়ী কলংক: বিচারক গোলাম রসুল

Comments are closed

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারক কাজী গোলাম রসুল তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সেনাবাহিনীর জন্য একটি চিরস্থায়ী কলংক হিসেকে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।  সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে এই মামলার দলিলের ভিত্তিতে রেডিও ধ্বনির ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে শেষ পর্ব।

রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের জীবন রক্ষায় সামরিক এবং গোয়েন্দা ব্যর্থতাকে সেনাবাহিনীর জন্য চিরস্থায়ী কলংক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারক কাজী গোলাম রসুল। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সেনাবাহিনীর জন্য এটি একটি চিরস্থায়ী কলংক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, বলে রায়ে মন্তব্য করেন ঢাকা জেলা এবং দায়রা জজ আদালত।

নাজিমউদ্দিন রোডে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে বিশেষ এজলাসে এক বছরের মতো সময় ধরে চলে ওই বিচার। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল। রায়টি এখন ঐতিহাসিক এক দলিল।

যেহেতু বিশাল রায়, বিচারক তাই এজলাসে পুরো রায় না পড়ে ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড আর চারজনকে বেকসুর খালাস দেয়ার মূল আদেশটি পড়ে শুনিয়েছিলেন। তবে গুরুত্ব বিবেচনায় রায়ের কিছু পর্যবেক্ষণও পাঠ করেছিলেন বিচারক।

সেই পর্যবেক্ষণে তিনি সুস্পষ্টভাবে সেনা কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা এবং রহস্যজনক আচরণের সমালোচনা করেছেন। ডেথ রেফারেন্সের পেপার বুকের দলিল ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, রায়ের একেবারে শেষদিকে এসে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে বিচারক কাজী গোলাম রসুল লিখেছেন: এই মামলায় প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিশেষ করে যারা ঢাকায় অবস্থান করছিলেন, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেননি, এমনকি পালনের কোনো পদক্ষেপও গ্রহণ করেননি।

সঙ্গে বিচারক একথাও বলেছেন ‘যথেষ্ট সময় পাওয়া সত্ত্বেও,’ তারা দায়িত্ব পালন করেননি। বিচারক লিখেছেন, সাক্ষ্য প্রমাণে পরিষ্কার যে, মাত্র দুটি রেজিমেন্টের খুবই অল্প সংখ্যক জুনিয়র সেনা অফিসার/সদস্য এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলো। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেনো এই কিছু সেনা সদস্যকে নিয়ন্ত্রণ/নিরস্ত্র করার চেষ্টা করেনি তা বোধগম্য নয়।

‘এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সেনাবাহিনীর জন্য একটি চিরস্থায়ী কলংক হিসেকে চিহ্নিত হয়ে থাকবে,’ বলে তিনি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। খুনি কিছু বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা হলেও, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সাক্ষীদের সাক্ষ্যের লাইনে লাইনে ফুটে উঠেছে প্রাতিষ্ঠানিক সেই ব্যর্থতার কথা।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মূল অভিযুক্ত ছিলো ২৪ জন। তাদের মধ্যে খন্দকার মুশতাক, মাহবুবুল আলম চাষী, ক্যাপ্টেন মোস্তফা এবং রিসালদার সারোয়ার ৯৬ সালে মামলার কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই মারা যাওয়ায় তাদেরকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। অন্য যে ২০ জনকে অভিযুক্ত করা হয় তাদের মধ্যে মেজর খন্দকার আব্দুর রশিদের স্ত্রী জোবায়দা রশিদ উচ্চ আদালতে রিভিশন মামলায় অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় বিচার হয় ১৯ জনের বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, অনারারি ক্যাপ্টেন আব্দুল ওয়াহাব জোয়ার্দার, দফাদার মারফত আলী এবং এল.ডি আবুল হাশেম মৃধাকে খালাস দেন বিচারিক আদালত।

কাঠগড়ায় থাকা মেজর ফারুক, মেজর শাহরিয়ার এবং আর্টিলারির কর্নেল মুহিউদ্দিনসহ ১৫ জনকে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। এই তিনজনসহ পলাতক ১২ জনের মধ্যে ল্যান্সারের মেজর মহিউদ্দিন এবং ক্যাপ্টেন বজলুল হুদাকে দেশে ফিরিয়ে এনে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর বাইরে বিচারিক আদালতের মতো উচ্চ আদালতেও মৃত্যুদণ্ড পাওয়া মেজর খন্দকার আব্দুর রশিদ, মেজর শরিফুল হক ডালিম, মেজর এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, মেজর রাশেদ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন মাজেদ এবং রিসালদার মোসলেহউদ্দিন বিদেশে পালিয়ে আছে। পলাতক অবস্থায় মারা গেছে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া মেজর আজিজ পাশা।

Comments are closed.

Web Design BangladeshWeb Design BangladeshMymensingh